বাংলাদেশ: সোমবার ২৭ জুন ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
১৩ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ২৭ জিলকদ ১৪৪৩ হিজরি

  বাংলাদেশ: সোমবার ২৭ জুন ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ২৭ জিলকদ ১৪৪৩ হিজরি  

শেষ আপডেটঃ ৭:০৫ পিএম

জেনে-বুঝে শিশুকে টিকা দিন

7 / 100

অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন: টিকা হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি স্বর্গীয় অনবদ্য উপহার। অনেক ভয়ানক রোগ প্রতিরোধ করে টিকা আমাদের সুরক্ষিত রাখে। হাম, মাম্পস, হুপিং কাশি, জলবসন্ত, পলিও, যক্ষ্মা ও ধনুস্টংকারসহ অনেক মারাত্মক রোগ থেকে টিকা আমাদের সুরক্ষিত রাখে। প্রত্যেক শিশুকে পরামর্শকৃত টিকাগুলো সময়মতো দেওয়ার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল ও সুনিশ্চিত করে। এসব টিক নবজাতক থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরীসহ বড়দের নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ বুহ্য তৈরির মাধ্যমে সুরক্ষা দেয়। যেসব শিশুদের টিকা দেওয়া হয় না তারা এসব রোগে আক্রান্ত হতে পারে, এমনকি তাদের এ জন্য মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

অতীতে এ রোগগুলো অসংখ্য শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। বর্তমানে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে অর্থাৎ টিকা নিলে শিশুরা অসুস্থ না হয়েও এসব রোগ থেকে ভালো প্রতিরোধ ক্ষমতা পেতে পারে। সাধারণত, জীবাণু একটি সম্প্রদায়ের মাধ্যমে দ্রুত সংক্রমণ করতে পারে এবং অনেক লোককে একই সঙ্গে অসুস্থ করে তুলতে পারে। পর্যাপ্ত মানুষ অসুস্থ হলে, এটি একটি প্রাদুর্ভাব রূপ নিতে পারে। তেমনটাই হয়েছে কোভিড-১৯ বা করোনা সংক্রমণে। যখন একটি নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত লোকেদের টিকা দেওয়া যায়, তখন সেই রোগটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পরতে পারে না। তখন পুরো সম্প্রদায়ের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।

জেনে নিন

শিশুদের জন্মগত ইমিউন সিস্টেম ও মায়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশিরভাগ জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করতে পারলেও, কিছু কিছু গুরুতর রোগ আছে যার থেকে তারা সুরক্ষিত থাকে না। তাই তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করার জন্য ভ্যাকসিন প্রয়োজন। শিশুদের জন্য টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। যে কোনো টিকা অনুমোদনের আগে অবশ্যই ব্যাপকভাবে এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই এবং মূল্যায়নের পরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত হয়।

* টিকা বা ভ্যাকসিন হলো ইনজেকশন বা তরল, মুখে খাওয়ানো হয়। টিকা ইমিউন সিস্টেমকে ক্ষতিকারক জীবাণুকে চিনতে এবং এ থেকে রক্ষা বা প্রতিরোধ করে। জীবাণু ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া হতে পারে।

* টিকাদানের সময় স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে বর্ণনা করুন শিশুর জ্বর, কাশি বা পাতলা পায়খানা আছে কিনা।

* শিশুর কোনো অ্যলার্জি আছে কিনা।

* আগে টিকা নেওয়া থাকলে, কোনো সমস্যা হয়েছিল কিনা।

টিকার সময়সূচি

টিকার সময়সূচি অনুযায়ী দেওয়া হয়। এ সময়সূচি শিশুদের জন্য যেসব টিকা সুপারিশ করা হয় তা তালিকাভুক্ত থাকে। কোনো টিকা, কত ডোজ এবং কোনো বয়সে দিতে হবে তা নির্দিষ্ট থাকে।

সরকার ইপিআইয়ের মধ্যে অতি জরুরি ১০টি রোগের অর্থাৎ যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, ধনুস্টংকার, হুপিংকাশি, পোলিও, হেপাটাইটিস বি, পিসিভি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, এমআর ভ্যাকসিন দিচ্ছে। এই ইপিআই ভ্যাকসিন দিলে যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, ধনুস্টংকার, হুপিং কাশি, পোলিও, হেপাটাইটিস বি জন্ডিস, হাম, নিউমোকক্কাসজনিত নিউমোনিয়া, হাম ও রুবেলা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। জšে§র পর থেকে প্রথম ১৪ দিনের মধ্যে বিসিজি ও পোলিও জিরো বা প্রথম ভ্যাকসিন দেওয়া যায়। এরপর বাচ্চার বয়স ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন থেকে বাকি টিকা দেওয়া শুরু হয়। এরপর একে একে এ টিকাগুলো শেষ করতে ১৫-১৬ মাসের মধ্যে ৫ বার টিকা কেন্দ্রে যেতে হয়। কিশোরী বয়সের মেয়েদের ১৫ বছর বয়স থেকে ইপিআই কেন্দ্র থেকে ধনুস্টংকারের আবার একটি ডোজ দেওয়া হয়। সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হয়। তবে ইপিআই-এর বাইরেও বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন আছে। বিশেষ প্রয়োজনে কোনো ভ্যাকসিন একটু দেরিতে দেওয়া যায়, কিন্তু আগে দিয়ে দেওয়া যায় না। বাচ্চা অসুস্থ থাকলে, বাড়িতে না থাকলে বা অন্য কোনো কারণে বিলম্বিত হলে, যেমন বর্তমান করোনা পরিস্থিতির জন্য, পরে তা দেওয়া যাবে এবং অবশ্যই দিয়ে নিতে হবে। বাদ দেওয়া যাবে না। নিুোক্ত ভ্যাকসিনগুলো ব্যক্তিগত খরচে দেওয়া যায়।

* দুইমাস বয়সের পর থেকেই রোটা ডায়রিয়ার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। ৬-৭ মাস বয়সের মধ্যেই ২-৩ ডোজ ডায়রিয়ার ভ্যাকসিন দিতে হয়।

* ৬ মাস বয়সের পর থেকেই দেওয়া যায় ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা। এ টিকা প্রতিবছরই নেওয়া লাগতে পারে। যাদের নিজেদের শ্বাস বা বংশগত শ্বাস রোগের সমস্যা আছে তাদের এটি নেওয়া ভালো। এ করোনার সময়েও যাদের এই ফ্লু ও নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন নেওয়া আছে তাদের জটিলতা কম হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

* ১ বছর বয়স হলেই হেপাটাইটিস ‘এ’ জন্ডিস ও চিকেন পক্সের (জলবসন্ত) টিকা দেওয়া শুরু করতে হয়। হেপাটাইটিস ‘এ’ এর টিকা ১টা নেওয়ার ৬-১২ মাসের মধ্যেই দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। চিকেন পক্সের দ্বিতীয় ডোজ স্কুলে যাওয়ার বয়স হলে নিতে হবে। দুই বছর বয়স হলে টাইফয়েড, মুখে খাওয়ার কলেরা ও মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন নেওয়া যায়। এ ছাড়া ৯ বছর থেকে মেয়েদের এইচপিভি ভ্যাকসিন দিতে হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি

পৃথিবীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে ইপিআই টিকাদান কর্মসূচি সাফল্যজনকভাবে পালন করে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছে। যা বিশ্বের দরবারে আজ প্রশংসিত।

করোনায় সব কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। ছোট শিশুদের মা বাবারা চিন্তায় আছেন তাদের বাচ্চাদের টিকা নিয়ে। কারণ দুই বছর বয়সের মধ্যেই সরকার প্রদত্ত ইপিআইয়ের টিকাগুলো দিতে হয়। ইউনিসেফ বলছে এপ্রিল মাসে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার শিশু টিকা পায়নি। তাই আগামী ৬ মাসে বাড়তি ২৮ হাজার শিশুর মৃত্যু আশঙ্কা আছে। ইপিআই-এর টিকা না দিলে যেই ১০টি রোগে সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় তা আবার বেড়ে যেতে পারে। করোনার কারণে এমনিতেই এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর অত্যধিক চাপ এবং একই সঙ্গে ইপিআই কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও হামের প্রাদুর্ভাব হওয়ার আশঙ্কা আছে।

তাই টিকা দিয়ে নিজের বাচ্চাকে প্রতিরোধ করা যায় এমন রোগ থেকে নিরাপদ রাখুন, পরিবার, সমাজ ওদেশকে নিরাপদ রাখুন।

লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সভাপতি, বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *