বাংলাদেশ: সোমবার ২৩ মে ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ২১ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরি

  বাংলাদেশ: সোমবার ২৩ মে ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ২১ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরি  

শেষ আপডেটঃ ৭:১৫ পিএম

মঞ্চের আলোর সঙ্গে জ্বলল আশার আলোও

7 / 100

এইনগরে বিনোদন: মঞ্চের আলোটি আবারও জ্বলল। সেই কবে থেকে বন্ধ সব! মহড়া কক্ষে তালা। মিলনায়তন অন্ধকার। নাট্যকর্মীরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। দূরে। মনের ক্ষুধা বাড়ছিল শুধু। নাটকে ফেরা আর হচ্ছিল না। এমন দুর্দিন কবে কাটবে? কাটবে তো? সংশয় সন্দেহ নিয়ে সামনের দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই এবং অতঃপর বন্ধ্যত্ব দূর হলো। মঞ্চের আলো জ্বলল, জ্বলল আশার আলোও। গত শুক্রবার থেকে আবারও শুরু হলো রাজধানীর নাট্যচর্চা।

হ্যাঁ, করোনাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত বছরের মার্চ থেকে মহামারীর শুরু। মাঝখানের কিছুটা সময় স্বাভাবিক গেলেও, অচিরেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে থাকে। কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় চলে যায় গোটা দেশ। একই কারণে বন্ধ হয়ে যায় নাট্য প্রদর্শনী। বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হলে গত ১১ আগস্ট হতে সব কিছু আবারও সচল হয়। এমনকি খুলে দেয়া হয় স্কুল-কলেজ। দাবি ওঠে নাটকের জন্য মহড়া কক্ষ ও হলগুলো খুলে দেয়ার। নাট্যজনদের পাশাপাশি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন সাংগঠনিকভাবে এ দাবি তোলে। কিন্তু ততদিনে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রযোজনা নিয়ে মঞ্চে উঠতে অনেক রকমের বাধা। বিশেষ করে দলগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। অক্সিজেনের মতোই জরুরী হয়ে ওঠে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা। শিল্পকলা একাডেমির মহড়া কক্ষ ও মিলনায়তন বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ চায় নাটকের দলগুলো। প্রযোজনার বিপরীতে প্রণোদনা চায়।

কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা শিল্পকলা একাডেমির এসব নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা দেখাচ্ছিল না। না দেখার, না শোনার ভান করে সময়ক্ষেপণ করছিল। প্রতিবাদে শুক্রবার একাডেমির নাট্যশালা প্রাঙ্গণে সমাবেশ করেন নাট্যকর্মীরা। অগত্যা সেখানে উপস্থিত হয়ে মহড়া কক্ষ ও মিলনায়তন ভাড়া মওকুফের সিদ্ধান্তের কথা জানান শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক। মূলত এ ঘোষণার পরই নাট্য প্রদর্শনীর সূচনা হয়। প্রথম দিন শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ হয় দুটি নাটক। দুটি বড় দল নাটক মঞ্চস্থ করে। জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে ছিল আরণ্যক প্রযোজনা ‘কহে ফেসবুক’র ১২তম প্রদর্শনী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের প্রভাব নাট্যভাষায় চমৎকার এবং যুগোপযোগী করে তুলে ধরা হয়। নাটকের রচয়িতা মামুনুর রশীদ। নির্দেশনাও তার।

একই দিন পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হয় ঢাকা থিয়েটারের ৪৯তম প্রযোজনা ‘একটি লৌকিক অথবা অলৌকিক স্টিমার।’ আনন জামান রচিত নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন শহীদুজ্জামান সেলিম। কাকতালীয়ভাবে হলেও, নতুন এ নাটকের গল্প মহামারীকেন্দ্রিক। প্রথম দফা করোনার পর পরই নতুন প্রযোজনা হিসেবে ‘একটি লৌকিক অথবা অলৌকিক স্টিমার’ মঞ্চে আনে ঢাকা থিয়েটার। একে একে পাঁচটি প্রদর্শনীও আয়োজন করতে সক্ষম হয়। এরই মাঝে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে আছড়ে পড়লে বন্ধ হয়ে যায় সব কিছু। প্রায় ছয় মাস পর ষষ্ঠ প্রদর্শনী নিয়ে মঞ্চে আসে ঢাকা থিয়েটার।

আলো জ্বলেছে মহিলা সমিতি মঞ্চেও। শুক্রবার সেখানে ছিল নতুন দল আপস্টেজের দ্বিতীয় প্রযোজনা ‘স্বপ্নভুক।’ সৈয়দ শামসুল হকের ‘জনক’ ও ‘কালোকফি’ উপন্যাস অবলম্বনে নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন সাইফ সুমন। ওইদিন সন্ধ্যায় নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে নাটকের উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়।

দ্বিতীয় দিনে শনিবার মূল দলগুলোর কোন নাটক না থাকলেও, শিল্পকলায় পুলিশ নাট্যদল ‘অভিশপ্ত আগস্ট’ নাটকটি মঞ্চস্থ করে। একাডেমির স্টেজ ম্যানেজার ফজলে রাব্বী সুকর্ণ জানান, সামনের দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ দলগুলো নাটক নিয়ে আসবে। সেভাবেই হল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

আসলেই কি নিয়মিত নাটক করবে মূল দলগুলো? এখন পর্যন্ত কী অভিজ্ঞতা? জানতে চাইলে আরণ্যক নাট্যদলের প্রধান ও বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। সব তছনছ হয়ে গেছে। শিল্প সংস্কৃতি বলুন বা নাটক, একে বাঁচিয়ে রাখার দায় শুধু শিল্পীদের নয়। বিশেষ করে এখন সরকারকে তা উপলব্ধি করতে হবে। করোনার ভয়াবহ আঘাত মোকাবেলায় নাট্য দলগুলোকে সরকারী প্রণোদনা দিতে হবে। সরকারী প্রতিষ্ঠান শিল্পকলা একাডেমির সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই একাডেমি শিল্পের বিকাশে তেমন কোন কাজ করছে না। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকা-েও হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্যালারি গ্র্যান্টের কথা বলছি। কিন্তু আজও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। দীর্ঘ ৫০ বছর নাটক করার পর আমরা এখন স্যালারি গ্র্যান্ট দাবি করতেই পারি। এটা আমাদের অধিকার। ভিক্ষা চাইছেন না, অধিকার চাইছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তা না হলে রাজপথে নেমে দাবি আদায় করতে হবে। সে জন্য নাট্যকর্মীদের প্রস্তুত থাকারও পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা থিয়েটারের প্রধান নাসিরউদ্দীন ইউসুফেরও অভিন্ন বক্তব্য। তিনি বলেন, হল ভাড়া মওকুফ করতে হবে। সেইসঙ্গে প্রতিটি প্রযোজনার বিপরীতে সরকারী প্রণোদনা দিতে হবে। তা না হলে আন্দোলন। নাটক বাঁচাতে এ আন্দোলনের বিকল্প থাকবে না। ঢাকা থিয়েটারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা অনেকদিন পর শো করেছি। কিন্তু এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। দলের সদস্যরা চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেছে। করোনার কারণে শিল্পীরা একত্রিত হতে পারছিলেন না। রিহার্সাল সম্ভব হচ্ছিল না। খরচের ব্যাপার ছিল। আর সংক্রমণের শঙ্কা তো ছিলই। তদুপরি শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চের লাইট সাউন্ড ভাল না। তবুও চর্চাটা স্বাভাবিক করতে হবে। তাগিদের জায়গা থেকে শো করেছি আমরা। এ ক্ষেত্রে সকলকে সহায়তার আহ্বান জানান তিনি। নাট্যদলগুলোর পাশাপাশি দর্শকদের নাটকে ফেরানোর ওপর জোর দেন। বলেন, ঢাকা থিয়েটার ৫০ জনের মতো দর্শক নিয়ে শো করেছে। করতে হবে। থামলে চলবে না।

সবার চেষ্টায় নিয়মিত হবে মঞ্চ নাটক, স্বাভাবিক হবে চর্চা- এমনটিই আশা করছেন বাকি নাট্যজন ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। চেয়ে আছেন দর্শকও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *